ভূরাজনৈতিক কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েছে দাবি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, ‘গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে অসংখ্য জাহাজ কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নভেম্বরে ১৮৪টি জাহাজ ও ১০টি কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এসেছে। আর ডিসেম্বরে এসেছে ২৯টি। সামনে আরো নিষেধাজ্ঞা আসার আশঙ্কা রয়েছে।’
রাজধানীর সিরডাপ মিলনাতনে গতকাল ‘রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জেস ইন দ্য এলপিজি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিন ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম। এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের সঞ্চালনায় বৈঠকে লোয়াব সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে ইরান থেকে জ্বালানি বের না হওয়ার কারণে চীনের মতো বড় ক্রেতারা ব্যাপক কেনাকাটা করছেন। ফলে বাংলাদেশের মতো ছোট ক্রেতারা সুযোগ কম পাচ্ছেন।’
দেশে কী পরিমাণ এলপিজি আমদানি করা হয় সে তথ্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘লোয়াব থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাদের কাছে পরিবেশকদের তালিকা চাওয়া হলেও অর্ধেক সদস্য তা দেননি। কী পরিমাণ আমদানি হচ্ছে তার তথ্যও পাওয়া যায় না। ডিসেম্বরে মাত্র ৬০-৯০ হাজার টন আমদানির কাগজ পেয়েছি।’
বিইআরসি চেয়ারম্যান এলপি গ্যাস ব্যবহারের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ২০২২ সালে ১২ লাখ ৯০ হাজার টন, ২০২৩ সালে ১২ লাখ ৮০ হাজার টন, ২০২৪ সালে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন, ২০২৫ সালে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন এলএনজি ব্যবহার হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ তিন মাসের (অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর) তুলনায় ২০২৫ সালের একই সময়ে ১ লাখ ৬৩ হাজার টন কম আমদানি হয়েছে। এছাড়া ১৮ নভেম্বর ২০ হাজার টন এলপিজি নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি এসে ফিরে গেছে। ওই জাহাজ যোগ হলে ১ লাখ ২৫ হাজার টন আমদানি হতো।
জালাল আহমেদ আরো বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আমরা লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নসহ অন্যান্য দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ চলমান রেখেছি। এখানে এসে দেখলাম লাইসেন্সের জন্য ১৯টি কাগজ লাগে, আমরা আলোচনা করেছি ১৩টি হলেও চলে। এদিকে বিইআরসির ফি ১৮ লাখ থেকে কমিয়ে ১০ লাখ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে দুই বছর আগে, তা এখনো মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে।’
এলপিজি সরবরাহে সংকট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের এলপিজি আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতের হাতে রয়েছে। তাই যারা আমদানি করছেন আর যারা করছেন না তাদের সবার সঙ্গে কথা বলেছি।’
বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘রমজান মাসে এলপিজির সংকট যাতে অতটা প্রকট না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসায়ীরা যেন সর্বতো চেষ্টা করেন, যত বেশি সম্ভব এ মাসে আমদানি করার। জানুয়ারিতে যদি ১ লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি চলে আসে, সেটা এখনকার সমস্যাটা কমিয়ে আনবে।’
বিশেষ অতিথি ক্যাব সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ‘এলপিজিকে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি আরো স্বচ্ছ হতে হবে। না হলে সামনে যে সরকার আসছে তারা সংকটে পড়বে।’
মূল প্রবন্ধে ড. ম. তামিম বলেন, ‘পাইপলাইনের গ্যাস পাচ্ছি না, আবার এলপিজির জন্য মানুষ ছোটাছুটি করছে।’
তিনি বলেন, ‘বহু জায়গা থেকে লাইসেন্স নিতে হয়, এটাই মনে হয় এলপিজির বড় বাধা। এছাড়া কোম্পানিগুলোকে এখন লাইসেন্স নবায়নেই বছরে ১ থেকে দেড় কোটি টাকা ফি দিতে হয়। এ অবস্থায় রেগুলেটরি সংস্কার না হলে অনেকে হারিয়ে যাবেন ও নতুন বিনিয়োগ আসবে না।’ নিয়ন্ত্রণমূলক না হয়ে নিরাপত্তামূলক নীতি হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন ড. ম. তামিম।
বৈঠকে স্বাগত বক্তব্যে এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ‘আমরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। আমরা দায়ে পড়েছি, অনেকদিন ধরে ব্যবসা করছি বলে। নতুন করে কেউ এ ব্যবসায় আসবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘ মাদার ভেসেল থেকে এলপিজি খালাস করা অত্যন্ত জটিল। এজন্য মহেশখালীতে ২০০ একর জমি বরাদ্দ দেন, যাতে সব অপারেটর মিলে সহজে পণ্য খালাস করতে পারে।’ লাইসেন্সসহ অন্যান্য অনুমোদনের জন্য পাঁচটি সংস্থায় যাওয়ার পরিবর্তে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসেরও দাবি জানান লোয়াব সভাপতি।
গোলটেবিল বৈঠকে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা জহির উদ্দিন স্বপন, জেএমআই গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক, যমুনা স্পেসটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলায়েত হোসেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক, পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক আলী ইকবাল নুরুল্লাহ, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিচালক আবুল হাসান এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামছুজ্জামান সরকার প্রমুখ।